আত্মপক্ষ ১

সালটা ২০০৫ বা ৬ হবে। কলকাতার এক বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন মাঠে বসেছে লিটিল ম্যাগাজিন লেখকদের আড্ডা। সদ্য লিখছি গল্প, বাকিরা রীতিমতন পোড় খাওয়া। নানান জিজ্ঞাসায় জানতে চেয়েছিলাম, একজন গল্পকারের গল্প লেখার উদ্দেশ্য কী? একজন বললেন, আমি যে সময়ে বেঁচে আছি, তার বিবরণ লিখে যাওয়াই লেখকের কাজ। জানতে চাইলাম, কেবলই বিবরণ? মত কি বাদ? তিনি থার্ড-ডিগ্রি বার্নড বিড়ি থেকে খানিক ধোঁয়া বুকে ভরে বললেন, মত যে পালটায়! আজ আমার যা মত, কাল নাও থাকতে পারে। আজ যদি মত দিই, কাল যদি সেটা পালটে যায়? তাই লেখায় মত দেওয়া আমি পছন্দ করি না। আবারও প্রশ্ন এলো মনে। তাহলে সংবাদ প্রতিবেদন আর গল্পের মধ্যেকার ফারাকটা কী? দু-আঙুলের টোকায় বিড়িটা কিছুটা দূরের ঘাসে ফেলে তিনি বললেন, ফারাক, ফ্যাক্ট লেখার ধরনে।

কিছুদিন পরে পাড়ার চায়ের দোকানে বসে দেখি, উলটো ফুটে একজন বৃদ্ধ পথ হাঁটতে হাঁটতেই, তার পাশে থাকা শনি মন্দিরের উদ্দেশ্যে প্রণাম করলেন। মন্দিরের গা ঘেঁষেই ইন্দিরা-রাজীবের সাদা মার্বেল মূর্তি। বৃদ্ধ তাদেরও প্রণাম করলেন। এই দৃশ্য যখন আমি গল্পে লিখছি, তাহলে আমি এটুকু লিখেই দায় সারবো? কিন্তু মনে যে প্রশ্ন জাগছে অনেক? মন জানতে চাইছে এই দেবতা, মানুষের বিভেদ ভুলে একজন বৃদ্ধের প্রণামের উদ্দেশ্য। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দাদার কথা মেনে নিলে, আমার মনের প্রশ্নগুলোর কী হবে? বিজ্ঞান শেখায়, যা দেখছো, তার পিছনের কারণ জানতে চাইবার প্রেরণার থেকেই বিশেষ জ্ঞানের জন্ম। তবে সাহিত্য কি বলছে এর উলটো কথা? না, তা কেন? দেখা, দেখে মনে জাগা প্রশ্ন, সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার তাড়া, আর সেই উত্তর খুঁজে পাওয়ার পর অথবা কেবল উত্তর খোঁজার প্রয়োজনটা সকলকে জানাবার বাসনা থেকেই তো সাহিত্য লেখা।

প্রথম যেদিন রুল-টানা ডায়েরিতে পঞ্চাশ লাইনের কবিতা লিখেছিলাম, আজ পিছন ফিরে তার কারণ খুঁজতে গেলে দেখি, সেদিনের সেই কাঁচা বয়সের কাল্পনিক দুঃখের কারণ খুঁজতেই অমন কাঁচা কাব্যের জন্ম। সে কবিতা শুধুই আমার বেদনা-কেন্দ্রিক হলেও, কবিতা লেখার কারণ বেদনার উৎস সন্ধানই। সে কেবল প্রতিদিনের প্রতিবেদন হলে তাকে আর কাব্য বলতাম না। ফলে যে বেদনার খোঁজ থেকে লেখার শুরু, তাকে কেবলই প্রতিবেদন করে ফেলা যায় কি?

চার বছর পর যখন আবার একটি গল্প সংকলন প্রকাশ পাচ্ছে, তার আগে এসব প্রশ্ন ফিরে এলো কেন? ফিরে আসবার কারণ আছে। লেখার তিন বছর পর আজ যখন আবার ‘রাক্ষসী’ গল্পটি ফিরে পড়ছি, তখন এই প্রশ্ন ফিরে আসার সঙ্গত কারণ পাচ্ছি।

তখন নব্বই শেষ হবে হবে। রচনা বই থেকে Y2K-এর লম্বা বাক্য মুখস্থ করতে হচ্ছে। আমাদের বাড়ির ঠিক উলটো দিকে, ভাড়াবাড়ির রিক্সা কাকু বিয়ে করে আনলেন ‘কদাকার’ এক ‘রাক্ষসী’-কে। কাকুর মৃত্যুর পর তার সেই স্ত্রী আর কার স্মৃতিতে থেকে গেলেন জানি না, তবে রয়ে গেলেন আমার মনে। এবার যদি জানতে চান, রইলেন কেন, তবে বলবো, একটা প্রশ্ন। প্রশ্নটি ছিলো, কাকু মারা যাওয়ার পর তাঁর ‘রাক্ষসী স্ত্রী’ ভাড়া বাড়ি ছেড়ে গেলেন কোথায়? হয়তো গল্প লেখার ইন্ধন ছিলো সেই প্রশ্ন। তবে সম্পূর্ণ গল্পটি কেবলই প্রশ্ন বা প্রতিবেদন নয়। উত্তর এবং উত্তরের খোঁজই এই গল্পের মূল চালিকা শক্তি।

(ক্রমশ…)

Leave a Reply

One response to “আত্মপক্ষ ১”

  1. মনে প্রশ্ন জাগলেও, উত্তর খোঁজার প্রয়াস আমরা অনেকে করি না। করলেও তা সামান্য, সীমিত এবং আবছা হয়ে যায় স্মৃতি। উত্তরের সন্ধান চলুক। আমরাও গল্প পড়ি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *